ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কায় সৌদি আরবের লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি ও জাহাজ চলাচলে নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল বহনকারী বেশ কয়েকটি ট্যাংকার তাদের স্বয়ংক্রিয় অবস্থান শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (AIS) বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে দেশটির লোহিত সাগরপথে তেল রপ্তানির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বুধবার (১২ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গত ২০ জুলাই হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্র অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইয়ানবু ও জাজানসহ সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনা এবং তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করার হুমকি দিয়েছে সংগঠনটি।
ইয়ানবু থেকে তেলবাহী জাহাজের গতিবিধি গোপন
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৩ জুলাইয়ের পর ইয়ানবু বন্দর থেকে সৌদি তেল বহনকারী বেশিরভাগ জাহাজের অবস্থান AIS-এর মাধ্যমে আর নিয়মিতভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। হামলার আশঙ্কায় জাহাজগুলো তাদের অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবেও বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দিয়েছে। ফলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির প্রকৃত পরিমাণ কত—তা নির্ভুলভাবে হিসাব করতে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বাজার বিশ্লেষকদের জন্য সমস্যা তৈরি হয়েছে।
বাব আল-মান্দাবেও কমেছে জাহাজ চলাচল
লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাব প্রণালিতেও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ার পর এই পথে দৈনিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় ৫০টি থেকে কমে ৩২টির কাছাকাছি হয়েছে।
জাহাজ মালিকদের জন্য যুদ্ধঝুঁকির বীমার খরচও বেড়েছে। কিছু ট্যাংকার কোম্পানি নিরাপদ পথ ব্যবহার করতে প্রচলিত রুট পরিবর্তন করে লোহিত সাগরের উত্তর দিকে যাত্রা করছে।
বিকল্প পথে তেল পাঠাচ্ছে সৌদি আরব
লোহিত সাগরের নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় সৌদি আরব কিছু তেল উত্তর দিকে সরিয়ে সুয়েজ খাল ও মিসরের SUMED পাইপলাইন ব্যবহারের মাধ্যমে ইউরোপীয় বাজারে পাঠানোর চেষ্টা করছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, মিসরের সিদি কেরির টার্মিনালে তেল লোডিং সম্প্রতি দৈনিক প্রায় ২ দশমিক ১৭ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছেছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশই সৌদি আরবের তেল বলে জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
জাজান তেল স্থাপনাতেও হামলার দাবি
এর আগে ৯ আগস্ট সৌদি আরবের জাজান এলাকায় আরামকোর একটি স্থাপনায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুথিরা দাবি করে, তারা ওই স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে হামলার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সীমিত ছিল।
আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা
লোহিত সাগর ও সৌদি তেল অবকাঠামোকে ঘিরে উত্তেজনা শুধু সৌদি আরবের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে সৌদি আরব আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদারে নতুন কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। রয়টার্সের পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছে এবং লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে।
বিশ্ববাজারেও প্রভাবের আশঙ্কা
লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে চাপ বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) বুধবার জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্নের কারণে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেল কমতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তেলের দাম, জাহাজ ভাড়া ও বীমা ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বা রিয়াদসহ প্রধান শহরগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। মূল উদ্বেগটি বর্তমানে লোহিত সাগর, তেল স্থাপনা ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তাকে ঘিরে।
